কিংবদন্তী জহির রায়হানের জন্মদিন

কিংবদন্তী জহির রায়হানের জন্মদিন

এসবিডি নিউজ24 ডট কম, ডেস্ক:  বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস যদি হাজার বছর পরেও লেখা হয় তাহলে যার নাম ছাড়া ইতিহাস পরিপূর্ণ হবে না সে ব্যক্তিটি জহির রায়হান। কিংবদন্তী জহির রায়হানের জন্মদিন ১৯ আগস্ট।


চলচিত্র ও সাহিত্য দুই ক্ষেত্রেই তিনি তার প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। ছিলেন প্রবলভাবে দায়বদ্ধ একজন মানুষও। আমাদের ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সংগ্রামী অভিযাত্রার প্রতিটি পর্যায়ে তিনি কেবল আলো হাতে জাতিকে পথই দেখাননি, ইতিহাসের বাঁকগুলো বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে তার রচনায়।


স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের পরপরই তার বিয়োগান্ত অন্তর্ধাণের হতবাক হয়ে যায় জাতি। মাত্র ৩৬ বছরের পরমায়ু নিয়ে চলচ্চিত্র ও সাহিত্য উভয় ক্ষেত্রে তিনি তাঁর প্রতিভার যে স্বাক্ষর, সৃষ্টিশীলতায় যে ফসল রেখে গেছেন, নিঃসন্দেহে তাই তাঁকে অমর করে রাখবে।


জহির রায়হান ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট বর্তমান ফেনী জেলার অন্তর্গত মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি তার পরিবারের সাথে কলকাতা হতে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) স্থানান্তরিত হন। তিনি ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬১ সালে সুমিতা দেবীকে এবং ১৯৬৬ সালে সুচন্দাকে বিয়ে করেন। দুজনেই ছিলেন সে সময়কার বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী।


জহির রায়হান বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর তাঁর সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেছেন।


১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়। চলচ্চিত্র জগতে তাঁর পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, ‘জাগো হুয়া সাবেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে।


তিনি সালাউদ্দীনের ছবি ‘যে নদী মরুপথে-এর  সহকারী হিসেবে কাজ করেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাঁকে ‘এ দেশ তোমার আমার’-এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান। জহির এ ছবির নামসঙ্গীত রচনা করেছিলেন। ১৯৬০ সালে তিনি রূপালী জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন (উর্দু ভাষার ছবি) এবং পরের বছর তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’ মুক্তি দেন।


জহির রায়হান ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ২১শে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। ভাষা আন্দোলন তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিতে। তিনি ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন।


কলকাতায় তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ ভূয়সী প্রশংসা করেন। সে সময়ে তিনি চরম অর্থনৈতিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তাঁর চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।


তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার ১৯৬৪ (হাজার বছর ধরে), নিগার পুরস্কার (‘কাঁচের দেয়াল’), বাংলা একাডেমি পুরস্কার ১৯৭১ (উপন্যাসঃ মরণোত্তর), একুশে পদক ১৯৭৭ লাভ করেন। (চলচ্চিত্রঃ মরণোত্তর) ও স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার ১৯৯২।


তাঁর লেখা বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে শেষ বিকেলের মেয়ে (১৯৬০), হাজার বছর ধরে (১৯৬৪), আরেক ফাল্গুন (১৯৬৯), বরফ গলা নদী (১৯৬৯) ও আর কত দিন (১৯৭০)।


তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্রসমূহ হচ্ছে, কখনো আসেনি (১৯৬১), সোনার কাজল (১৯৬২) (কলিম শরাফীর সঙ্গে যৌথভাবে), কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩), সঙ্গম (১৯৬৪), বাহানা (১৯৬৫), আনোয়ারা (১৯৬৭), বেহুলা (১৯৬৬), জ্বলতে সূরযকে নীচে, জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০), স্টপ জেনোসাইড (চলচ্চিত্র) (১৯৭১), এ স্টেট ইজ বর্ন (১৯৭১) ও লেট দেয়ার বি লাইট (অসমাপ্ত) (১৯৭০)।

এসবিডি নিউজ ডেস্ক