বিপর্যস্ত ‘বাজার’ ব্যবস্থা
শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ, এসবিডি নিউজ24 ডট কম: অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ আছে বাজারে। তাহলে পণ্যমূল্য নাগালের বাইরে কেন? এই ‘কেন’ এখন প্রতিটি সাধারণ মানুষের প্রশ্ন। আয় বাড়ছে না। ব্যয় বাড়ছে ক্রমশ । আয় ব্যয়ের হিসাব মিলাতে না পেরে বিপর্যস্ত দশা মানুষের। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, “এই সমস্যা মূলত বাজার ব্যবস্থাপনায়। এই ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের কালোবাজারি এবং অতিমুনাফা লাভের প্রত্যাশা লুকিয়ে আছে।” প্রশ্ন হচ্ছে সরকারের বেঁধে দেয়া দাম বাজারে কার্যকর হচ্ছে কি না? কেউ উচ্চ লাভের আশায় মজুতদারি করেছে কি না? এসব মনিটরিং করার দায়িত্ব সরকারের। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, “সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এসব মনিটরিং করছে।” কিন্তু সরকার প্রদত্ত ‘মনিটরিং’-এর কোনো ম্যাজিক দৃশ্যমান নয়। যেটা দৃশ্যমান সেটা হচ্ছে, ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ। মলিন বদন।
রাজধানীর বিভিন্ন ‘বাজার’ পর্যবেক্ষণ করে পণ্যমূল্যের যে তালিকা করা হয়েছে, সেটা হলো:—— আলু ও কাঁচা পেঁপে ছাড়া বাজারে বেশিরভাগ সবজি ৮০-১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সেইসঙ্গে মাছ-মুরগিতেও নেই স্বস্তি। বেগুন, শিম, বরবটি থেকে শুরু করে টমেটো; সবই স্বল্পআয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। কয়েকদিন ধরে বলা হচ্ছিল, বৃষ্টি ও বন্যার কারণে বাড়ছে দাম। ব্রয়লার মুরগির ডিম ডজনপ্রতি ১৪০-১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অপরিবর্তিত গরু ও খাসির মাংসের দাম। এছাড়া পেঁয়াজ-রসুনের দাম কেজিপ্রতি ৫-১০ টাকা বেড়েছে। গত সপ্তাহে রুই মাছের সর্বনিম্ন দাম ছিল ৩০০ টাকা। যেটা চলতি সপ্তাহে ৩২০-৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় তেলাপিয়ার (জীবিত) দাম ছিল কেজিপ্রতি ২২০-২৪০ ও মৃত ১৯০-২১০ টাকা। পাবদা আকারভেদে ৩২০-৪০০ টাকা। চাষের কৈ ২২০-২৪০ টাকায় বিক্রি হয়। জাতীয় মাছটিও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে এবং এর দাম সমান্তরাল ধারায় বাড়ছে। রুপালি ইলিশ প্রতি কেজি ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেড় কেজি ওজনের ইলিশ ৩ হাজার টাকায়, ৮০০-৯০০ গ্রামের ১ হাজার ৯০০ এবং ৬০০-৭০০ গ্রাম ১ হাজার ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
গত এক সপ্তাহে চালের বাজারে খুব একটা তারতম্য নেই। পাইকারি বাজারে মিনিকেট কেজিপ্রতি ৭০-৭৬ ও স্পেশাল মিনিকেট ৮০-৮২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আটাশ চালের দাম ৫৬-৬০ টাকা। স্বর্ণা ও গুটি (মোটা) ৫২-৫৪ টাকা, দেশি নাজিরশাইল ৭৮-৮০, ভারতীয় নাজিরশাইল ৭২ ও লোকাল কাটারিভোগ ৮০-৮২, সুগন্ধি কাটারিভোগ ১৩২-১৩৪ ও বাসমতি চাল ৮৮-৯০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেছেন, “আসলে ভোক্তারা নানাভাবে ঠকছেন। নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলো তাদের দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। মূলত সিন্ডিকেট বলতে কিছু নেই। বেপারী ফরিয়াদের খপ্পরে পড়ে কিছু কিছু পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাগুলোকে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ রইল।”
পত্রিকান্তরে জানা যায়, ২০২২ খ্রিস্টাব্দে ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্য যেমন; চাল, অপরিশোধিত সয়াবিন, চিনি, জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দাম বেড়ে গিয়েছিল অস্বাভাবিক হারে। দুই–আড়াই বছরে বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের বেশির ভাগের দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে এলেও বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)-এর চলতি বছরের আগস্ট মাসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, থাইল্যান্ডে এখন ৫ শতাংশ ভাঙা চালের মেট্রিক টনপ্রতি দর ৩৮১ মার্কিন ডলার (এফওবি মূল্য, অর্থাৎ জাহাজভাড়া ছাড়া), যা এক বছর আগে ছিল ৬১৬ ডলার। এক বছরে দাম কমেছে ৩৮ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে চালের দাম বরাবরই বাড়তির দিকে। বাংলাদেশ গত জুন পর্যন্ত আগের এক বছরে ১৪ লাখ টন চাল আমদানি করেছে। তারপরও দাম কমছে না। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসের শেষ দিকে ঢাকার বাজারে মোটা চালের দাম ছিল ৫২-৫৫ টাকা কেজি, যা এখন ৫৫ থেকে ৬০ টাকা।
বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে বাংলাদেশেও বাড়বে এবং বিশ্ববাজারে দাম কমলে বাংলাদেশেও কমবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবতা হলো আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে এখানে খুব কম ক্ষেত্রেই নিত্যপণ্যের দাম নির্ধারিত হয়। ২০২২ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ শুরু করার পর বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেল, চিনি, জ্বালানি তেল, গ্যাসসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এর পেছনে বৈশ্বিক প্রভাবের পাশাপাশি বিগত সরকারের ভুল নীতিও দায়ী বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রের অর্জন ধরে রাখতে হলে মূল্যস্ফীতির পরিমাণ কমাতেই হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সামনে তিনটি উপায় আছে। ১. সরকারি চ্যানেলে কম দামে খাদ্য সরবরাহ বাড়ানো। ২. বাজার তদারকি জোরদার করা এবং ৩. রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির কারণে ‘বাজার’-এর এমন বেহাল দশা। ‘মূল্যস্ফীতি’ একটি পরিচিত শব্দ। যেটির মূল্য আমাদের মতো সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। ২০২২ খ্রিস্টাব্দে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের আলোকে জানা গেছে, অর্থনীতিবিদরা আগের বছর বা মাসের সঙ্গে অথবা কোন নির্দিষ্ট সময়কালের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা করে খাদ্য, কাপড়, পোশাক, বাড়ি, সেবা ইত্যাদি বিভিন্ন উপাদানের মূল্য বৃদ্ধির যে পার্থক্য যাচাই করেন সেটাই মূল্যস্ফীতি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “মূল্যস্ফীতি দিয়ে আমরা যেটা বুঝি তা হলো, কোন একটা নির্দিষ্ট সময় থেকে পরবর্তী আরেকটি সময়ে দাম কেমন বেড়েছে? যেমন ধরুন একটা জিনিসের দাম ২০২০ খ্রিস্টাব্দে ছিল ৫ টাকা, পরবর্তী বছর তা হয়েছে ৬ টাকা। সব জিনিসের দাম তো একইরকমভাবে বাড়ে না। বিভিন্ন জিনিসের মূল্য বৃদ্ধির তথ্য একটি পদ্ধতির মাধ্যমে গড় করে মূল্যস্ফীতি বের করা হয়।”
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবতা হচ্ছে, বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে উচ্চশ্রেণির মানুষের ভোগান্তি না হলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের কষ্ট বাড়ে। পণ্যের দাম বেশি হওয়ায় তা দিয়ে তাদের চাহিদা মেটাতে কষ্ট হয়। সেই কষ্ট তখন আরও বহুগুণ বেড়ে যায়, যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা না যায়। এমন ভয়াবহতা আমরা অতীতে যেমন দেখেছি, বর্তমানেও দেখছি। বিগত সরকারের আমলে চালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বাজার সিন্ডিকেটের দোহাই দেয়া হতো। ক্ষমতার পালাবদলের পর অনেক কিছু বদল হলেও বাজার সিন্ডিকেটের প্রভাব এতটুকু কমেছে, এর প্রমাণ নেই। পরিবহনে চাঁদাবাজি কমেনি, বদল হয়েছে চাঁদাবাজদের চেহারা। পণ্যের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে থাকেন। তাঁদের এই অভিযোগ পুরোপুরি অসত্য বলার সুযোগ নেই। দিনাজপুর থেকে কোনো পণ্য ঢাকা বা চট্টগ্রামে নিতে যদি ঘাটে ঘাটে মালিককে চাঁদা দিতে হয়, তিনি দাম বাড়িয়েই সেটি পুষিয়ে নেবেন এবং সেটাই স্বাভাবিক। অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পর বড় বড় সংস্কারের আওয়াজ উঠেছে। এসব সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা কেউ অস্বীকার করছে না। কিন্তু নিত্যপণ্যের দাম সীমিত আয়ের মানুষের নাগালে না রাখতে পারলে কোনো সংস্কারই কী কাজে আসবে?
মূল্যস্ফীতি, সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজ, কালোবাজারি, মুনাফা লোভী—— এই শব্দগুলো পরিচিতি পেয়েছে। এই শব্দগুলোর প্রয়োগ ঘটছে প্রতিনিয়ত, প্রায় প্রতি ক্ষেত্রে। আমরা দেখছি, ঠুনকো অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা একেক সময় একেক পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দিচ্ছে। খুচরা বাজারে ক্রেতারা সেসব পণ্য অস্বাভাবিক দাম দিয়ে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। সাধ্য না থাকলে এই বাধ্যবাধকতাও পরাস্ত হবে এক সময়। সেই সময়টা খুব দূরে বলা যাবে না যদি দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়। ‘বাজার’ ব্যবস্থা নিয়ে অনেক পদক্ষেপ ও পরিকল্পনার কথা জানা যায় বিভিন্ন মাধ্যম থেকে। বিপর্যস্ত এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয় পত্রিকায়। বহু আলোচনা চলে অবিরত ধারায়। কিন্তু কাজের কাজ কিচ্ছু হচ্ছে না। একে অপরের ঘাঁড়ে দোষ চাপিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তাঁরাই তুলতে পারেন, যাদের আর্থিক সংগতি আছে। যাদের সেই সংগতি নেই তাঁরা এমন এক জালে ‘বন্দি’, যেটা দৃশ্যমান নয়। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র তাঁদের উপলদ্ধিতে আসবে, যারা একই বৃত্তের বাসিন্দা। যাদের কাছে জীবনের অর্থ অভিশাপ, বেঁচে থাকা নিদারুণ অভিলাষ।।
[লেখক: প্রধান সম্পাদক, এসবিডি নিউজ24 ডট কম।]
