জলবিদ্যার প্রয়োগ ব্যবস্থার গুরুত্ব

জলবিদ্যার প্রয়োগ ব্যবস্থার গুরুত্ব

২১ জুন ‘বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস’

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ, এসবিডি নিউজ24 ডট কম: পৃথিবীর তিন ভাগ জল, এক ভাগ স্থল। গাণিতিক হিসেব অনুযায়ী, পৃথিবীতে পানির পরিমাণ শতকরা ৭১ শতাংশ আর মাটি বা স্থলের পরিমাণ শতকরা ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ আড়াই ভাগ জল, এক ভাগ স্থল! জল এমন একটি অজৈব যৌগ যেটি স্বচ্ছ, স্বাদহীন, গন্ধহীন এবং প্রায় বর্ণহীন রাসায়নিক পদার্থ। এটি পৃথিবীর জলমণ্ডল এবং সমস্ত পরিচিত জীবের তরল পদার্থের প্রধান উপাদান। খাদ্য শক্তি বা জৈব মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সরবরাহ না করেও এটি সমস্ত পরিচিত জীবনের জন্য অত্যাবশ্যক। জীবিকার স্বার্থে জলবিদ্যা সম্পর্কে ধারণা থাকা আবশ্যক। জলবিদ্যা (হাইড্রোলজি) হলো পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহের জলের গতিবিধি, বন্টন এবং ব্যবস্থাপনার বৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন। এটি জলচক্র, জল সম্পদ এবং নিষ্কাশন অববাহিকার স্থায়িত্বের মতো বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত করে। হাইড্রোগ্রাফি বিষয়ে জনসচেতনতা এবং সাগর-মহাসাগরবিষয়ক জ্ঞান বৃদ্ধিতে প্রতিবছর ২১ জুন ‘বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস’ পালিত হয়। ইন্টারন্যাশনাল হাইড্রোগ্রাফিক অরগানাইজেশন (আইএইচও) এই দিনটি পালনে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। ২০২৫ সালের দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হল ‘সিবেড ম্যাপিং: এনাবলিং ওশান অ্যাকশন।’

এই প্রতিপাদ্য নির্ধারণে আইএইচও-এর কৌশলগত পরিকল্পনা গুলোর মধ্যে রয়েছে, ১. সমুদ্রের জ্ঞান এবং টেকসই ব্যবহার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা। ২. সমাজের সুবিধার জন্য হাইড্রোগ্রাফিক ডেটার ব্যবহার বৃদ্ধি এবং এর আন্তঃসম্পর্ক তুলে ধরা। ৩. সমুদ্রের কর্মকাণ্ডকে সক্ষম করার মূল চাবিকাঠি হিসেবে সমুদ্র ম্যাপিংয়ের গুরুত্বকেও তুলে ধরা।

প্রস্তাবিত নীতিবাক্যটি টেকসই উন্নয়নের জন্য মহাসাগর, সমুদ্র এবং সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ এবং টেকসই ব্যবহারের জন্য বিশ্বব্যাপী আকাঙ্ক্ষায় একটি প্রাসঙ্গিক অংশীদার হিসাবে আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক সম্প্রদায়ের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে।

বলা বাহুল্য যে, হাইড্রোগ্রাফার হলেন একজন পেশাদার ব্যক্তি, যিনি হাইড্রোগ্রাফি, অর্থাৎ জলের তলদেশের বৈশিষ্ট্য এবং গঠন পরিমাপ ও ম্যাপিং করার কাজে নিয়োজিত। তারা সমুদ্র, নদী, হ্রদ এবং অন্যান্য জলভাগের গভীরতা, তলদেশের গঠন, পানির স্তর, স্রোত, এবং অন্যান্য ভৌত বৈশিষ্ট্যগুলি নিয়ে কাজ করেন। এই তথ্যগুলি ন্যাভিগেশন, সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণা, উপকূলীয় অঞ্চলের পরিকল্পনা, এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

সমুদ্রতল ম্যাপিংয়ের একটি সামাজিক সুবিধা হল সমুদ্র জরিপ এবং সমুদ্র মানচিত্রায়নে (আইএইচও) মানীকরণের ঐতিহ্যবাহী সম্পদ হিসেবে নটিক্যাল চার্টিংয়ের সমর্থনে বেসলাইন তথ্য, তবে এটি টেকসই সামুদ্রিক শক্তি, মৎস্য ও উপকূলীয় পর্যটনকে সমর্থন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, অথবা সমুদ্রের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নীল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। জানা যায়, উনিশ শতকের শেষের দিকে বিশ্বব্যাপী হাইড্রোগ্রাফার এবং সমুদ্রবিজ্ঞানীরা হাইড্রোগ্রাফিক কার্যক্রম তদারকি ও নটিক্যাল চার্টিং সার্ভিসের জন্য সর্বজনীন পদ্ধতি গ্রহণের উদ্দেশ্যে একটি স্থায়ী কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৯, ১৯০৮ এবং ১৯১২ সালে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১৯ সালে যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সের হাইড্রোগ্রাফারদের সহযোগিতায় লন্ডনে একটি আন্তর্জাতিক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। ২৪টি দেশের হাইড্রোগ্রাফাররা সেই সমাবেশে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরে আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক ব্যুরো (আইএইচবি) নামে একটি স্থায়ী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হয়।

১৮টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে ১৯২১ সালের ২১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে আইএইচবি-এর কার্যক্রম শুরু হয়। বিশিষ্ট সমুদ্রবিজ্ঞানী প্রিন্স অ্যালবার্ট-১ মোনাকোতে সংস্থাটির প্রধান অফিস স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখন থেকেই এর প্রধান কার্যালয় মোনাকোতে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৭০ সালে সব সদস্য রাষ্ট্রের সম্মতিক্রমে ‘আইএইচবি’ নামটি পরিবর্তন করে ইন্টারন্যাশনাল হাইড্রোগ্রাফিক অর্গানাইজেশন ‘আইএইচও’ নামটি গৃহীত হয়। এখন পর্যন্ত ৯৮টি দেশ এর সদস্য রাষ্ট্র হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ২০০১ সালের ২ জুলাই ৭০তম দেশ হিসাবে সংস্থাটির সদস্যপদ লাভ করে।

হাইড্রোগ্রাফিক সেবার গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রায় সব উপকূলীয় দেশই তাদের নিজস্ব হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করেছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) সেইফটি অব লাইফ অ্যাট সি (সোলাস) কনভেনশন অনুযায়ী সব উপকূলীয় দেশের প্রতি যথাযথ হাইড্রোগ্রাফিক সেবা ও নটিক্যাল চার্টিং নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিসেস গঠিত হয়। একই বছর বাংলাদেশ সরকার এদেশের সমুদ্র এলাকার হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের জন্য নৌবাহিনীকে এবং অভ্যন্তরীণ জলপথের জরিপের জন্য বিআইডব্লিউটিএ’কে দায়িত্ব অর্পণ করেন। এরপর থেকে ধীরে ধীরে আমাদের হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিস ক্রমান্বয়ে একটি পেশাদার সংস্থা হিসাবে বিকশিত হয়েছে।

হাইড্রোগ্রাফিক বিষয়ে দক্ষ জনবল সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ১৯৮৩ সালে হাইড্রোগ্রাফিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। বাংলাদেশে এ ধরনের এটিই একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গর্বের বিষয় এই যে, ২০০৫ সালে নৌবাহিনীর হাইড্রোগ্রাফিক স্কুলটি ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অন স্ট্যান্ডার্ডস অব কম্পিটেন্স (আইবিএসসি) থেকে ক্যাটাগরি ‘বি’ লেভেলের হাইড্রোগ্রাফিক প্রশিক্ষণ পরিচালনা করার স্বীকৃতি অর্জন করে। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিএন হাইড্রোগ্রাফিক স্কুলের খ্যাতি আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। স্কুলটি শুধু অন্যান্য সরকারি সংস্থার হাইড্রোগ্রাফারদেরই নয়, বিদেশি শিক্ষার্থীদেরও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির সভাপতি টাইসন ব্রাউন এক নিবন্ধে লিখেছেন, নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু অর্থাৎ ক্রান্তীয় বলয় হতে শুরু করে পৃথিবীর মেরু অঞ্চলসমূহের মধ্যবর্তী এলাকার সমভাবাপন্ন জলবায়ুর অঞ্চল গুলোতে ইদানিং আবহাওয়ার ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কিছু কিছু দেশে মাঝারী বা ভারী বর্ষায় বন্যার কবলে পড়তে হচ্ছে। আক্রান্ত এলাকায় ঠিকমতো ত্রাণ না পৌঁছানোর ফলে মৃত্যৃর ঘটনাও ঘটে। এসব পরিস্থিতি মোকাবেলায় নূন্যতম ধারণা থাকলে অনেকাংশে দুর্ভোগ কম হতে পারে।

সমুদ্রের ক্রমশ দূষণ ও ক্ষতি হ্রাস করার জন্য সব অংশীজনকে একই কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসে সমষ্টিগতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে জাতিসংঘ ২০২১-২০৩০ সালকে সমুদ্রবিজ্ঞানের দশক হিসাবে ঘোষণা করেছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় ওয়ার্ল্ড ওশান এসেসমেন্টে উদ্ঘাটিত হয়। সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সমুদ্র অতি দ্রুত তার জীববৈচিত্র্য হারাচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা যদি ৯ বিলিয়নে এসে দাঁড়ায়, তাহলে সমুদ্রের ওপর মানুষের কর্মকাণ্ডের চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে। এ কারণে অভিযোজন কৌশল এবং বিজ্ঞানভিত্তিক নীতির আলোকে বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। সমুদ্র বিজ্ঞানের এই দশক নতুন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশের মাধ্যমে আমাদের সাগর-মহাসাগরকে গভীরভাবে জানতে আরও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এই দশকের মূল লক্ষ্যগুলো হলো, টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ড নির্ধারণ করা, সমুদ্রের বিষয়ে সর্বজনীন জ্ঞান অর্জন করা এবং লব্ধ জ্ঞানের ব্যবহার বৃদ্ধি করা। বস্তুত টেকসই উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে হাইড্রোগ্রাফিক কর্মকাণ্ড ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

সমুদ্রের টেকসই ব্যবহারের বিষয়টি এখন আর বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং আমাদের ধরণির অস্তিত্বের লড়াই। বাংলাদেশ, তথা বিশ্বের হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিসগুলো এসব তথ্য-উপাত্তের অন্যতম মূল জোগানদাতা। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিশ্বজুড়ে হাইড্রোগ্রাফাররা জাতিসংঘের সমুদ্র দশকের প্রতি অবদান রেখে চলেছেন। ‘বিশ্ব জলবিদ্যা দিবস’ পালনের মূল উদ্দেশ্য হল, জলবিদ্যা বিজ্ঞানীদের কাজ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং জলবিদ্যা গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরা। সাধারণ মানুষকে জল সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জলবিদ্যার ভূমিকা সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা। সুতরাং, ‘বিশ্ব জলবিদ্যা দিবস’ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন যা জলবিদ্যা বিজ্ঞান এবং এর প্রয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরে।।

[লেখক: প্রধান সম্পাদক, এসবিডি নিউজ24 ডট কম।]

প্রধান সম্পাদক