অগ্রসর নাগরিকের জন্যই কী রাজউক?

অগ্রসর নাগরিকের জন্যই কী রাজউক?

প্রণব মজুমদারঃ

সুলভ মূল্যে রাজধানীতে ঠিকানাবিহীন মানুষের আবাসন সমস্যার সমাধান করার দায়িত্ব সরকারের। সরকারের পক্ষে সে দায়িত্ব পালন করার কথা রাজধানী উন্নয়ণ কর্তৃপক্ষ বা রাজউকের। কিন্তু রাজউক এ ক্ষেত্রে সামর্থবান এবং প্রভাবশালীদেরই সেবা করে আসছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যমত্ম সকল সরকারের আমলেই রাজউকের আবাসিক প্রকল্পগুলোতে সুবিধাভোগি হয়েছেন শিল্পপতি, আমলা, সৈনিক-আইন শৃংখলা রক্ষাকারী সদস্য, রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ ধনিক শ্রেণী। এবারও রাজউকের সে নীতির ব্যতিক্রম হবে না বলে মনে হচ্ছে।

রাজধানীর পোস্তগোলার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পে মোট ২০টি শ্রেণীতে প্লট বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। ৩৮১ দশমিক ১৯ একর আয়তনের এই প্রকল্পে ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ২ লাখ মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে বলে রাজউক কর্মকর্তাদের ধারণা। ঝিলমিলে প্লট আগ্রহীদের কাছ থেকে গত বছরের জুন থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত আবেদনপত্র জমা নেয় রাজউক। সম্প্রতি ঘোষিত ফলাফলে ৫২০টি প্লটের বিপরীতে মোট আবেদন জমা পড়ে ১৯ হাজার ৩৫৮টি। প্রকল্পে মোট প্লট এক হাজার ২০০টি। মোট আবেদনকারির সংখ্যা ৩৫ হাজার। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-সাংসদ এবং বিচারপতি শ্রেণীর আবেদনকারী সবাইকে প্লট দেয়া হবে। মোট পস্নটের মধ্যে ১০ শতাংশ সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। বাকি কোটার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ৫, সচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব ১০, উপসচিব ও সহকারী সচিব ৫, ২য়, ৩য় এবং ৪র্থ শ্রেণীর সরকারী কর্মচারীর জন্য ৫, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ১২, বেসরকারী চাক্রিজীবি ১০, বেসরকারী শিক্ষক ২, শিল্পী, সাহিত্যিক ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ২, আইনজীবি ২, কৃষিবিদ ২, প্রকৌশলী ২ চিকিৎসক ২, প্রবাসী বাংলাদেশী ১০, সাংবাদিক ২ এবং অন্যান্যের জন্য ২৯ শতাংশ বরাদ্দ দেয়ার সিদ্ধামত্ম রাজউকের।

কোটা সাধারনত অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য করা হয়। অথচ রাজউককে দেখছি অগ্রসর লোকদের জন্য কোটা পদ্ধতি চালু রেখেছে। অর্থাৎ স্বাবলম্বীকে আরো সামর্থ্যবান করার জন্যই মনে হয় রাজউকের জন্ম। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের ব্যবস্থা করে ভহমিহীন ও অনগ্রসর জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরন করাও সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। দেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে অনগ্রসর শ্রেণী হচ্ছে বেসরকারী চাক্রিজীবি, সাধারণ শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। মূল্যস্ফীতির ক্রমবর্ধমান চাপে এসব শ্রেণীর পেশাজীবির নাভিশ্বাস অবস্থা। সীমিত আয় রোজগারে এদের জীবনের চাকা ঘোরে অনেকটা ঠেলাগাড়ির মতো। মহানগরে আকাশছোঁয়া ইমারতে গগণচুম্বী মূল্যের ফ্ল্যাট বা জমি কেনার সামর্থ্য তাদের নেই। কিন্তু রাজউক অনগ্রসর এসব শ্রেণীর জন্য কোটা বরাদ্দ না বাড়িয়ে বরং অগ্রসর বা সামর্থ্যবানদের তৈলাক্ত মাথায় তেল দিচ্ছে। কোটিপতিকে আরো বানাচ্ছে ধনবান। রাজউকের নীতি হচ্ছে শিল্পপতিদের সস্তায় প্লট দিবো, সচিবদেরও দিবো। তাদের জন্য কোটাও বেশি বরাদ্দ রাখা হবে। বিচারপতি -মন্ত্রী- সংসদ সদস্য সবাইকে প্লট দিতে হবে। সামর্থ্যবান এসব শ্রেণীর লোকেরা কোটায় তাও আবার অতি মাত্রায় প্লট পাবেন সরকারি মূল্যে যাকে বলা যায় রেশনিং মূল্যে। আদৌ কি এদের জমির দরকার আছে ? বিশেষ করে বাসস্থানের জন্য।

সরকার মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বসবাসের জন্য ন্যাম ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিয়েছে। তাছাড়া বিশাল পরিসরের সরকারি বাসভবন ব্যবহার এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকেন তারা। শিল্পপতি-ব্যবসায়ি শ্রেণীর জন্য রয়েছে বড় বড় ডেভেলপার। আছে রাজউক অনুমোদিত বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো এবং ব্যক্তি শ্রেণীর তৈরি করা বিলাসবহুল অভিজাত ফ্ল্যাট বা জমি।

শিক্ষিত জাতি বিনির্মাণে যে শ্রেণীকে বেশি অবদান রাখতে হয় তারা হলেন শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। দেশ ও জাতির উন্নয়নে যেখানে এদের অবদান অপরিসীম, সেখানে রাজউকের কাছে এদের গুরম্নত্ব একেবারেই কম। ৩টি শ্রেণীতে মাত্র ২ ভাগ করে ৬ শতাংশ কোটা বরাদ্দ। ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পে পস্নট বিতরণে এ কেমন রসিকতা রাজধানী উন্নয়ণ কর্তৃপক্ষের ?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরির দায়িত্ব যাদের দিয়েছেন সামাজিকভাবে অনগ্রসর সেই শ্রেণীভুক্ত পেশাজীবী সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি এবং শিক্ষকদের প্রতি কেনো এতো অবহেলা ? কেন রাজউক পারে না ৩টি শ্রেণীতে বরাদ্দ বাড়াতে ? নিরমত্মর খেটে খাওয়া পেশার একজন সংবাদকর্মী হিসেবে মনে করি ৩টি শ্রেণীতে ১০ ভাগ করে মোট ৩০ শতাংশ কোটা এ ক্ষেত্রে বাড়িয়ে দেয়া উচিত। তাতে অনগ্রসর শ্রেণীর সামাজিক মর্যাদা কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পাবে। ফলে এসব পেশাজীবী অপেক্ষাকৃত সসত্মা মূল্যে স্বপ্নের ঠিকানা বাসত্মবায়নের পথে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পাবে।

 

প্রণব মজুমদার – অর্থনীতি বিষয়ক সাংবাদিক

reporterpranab@gmail.com

 

অতিথি লেখক