শ্রেষ্ঠতম গৌরব ও অহঙ্কারের দিন

শ্রেষ্ঠতম গৌরব ও অহঙ্কারের দিন

নিজস্ব প্রতিনিধি,এসবিডি নিউজ24 ডট কম: ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম গৌরব ও অহঙ্কারের দিন। পৃথিবীর মানচিত্রে এই জাতির বীরত্বের আত্মপ্রকাশের আজ ৪৫তম বার্ষিকী। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে জাতি স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। সেদিন জাতি নির্ভয়ে গেয়ে উঠেছিল বিজয়ের অবিনাশী গান। সেই থেকে ১৬ ডিসেম্বর এই জাতির অহঙ্কারের বিজয় দিবস।


১৯৭১ সালের এই দিনে বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম হয় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের। হানাদার পাকিস্তানি সেনারা যে অস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে এই জাতির বুকে, হাতের সেই অস্ত্র পায়ের কাছে নামিয়ে রেখে একাত্তর সালের এই দিনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে। আজ তাই রক্তনদী পেরিয়ে আসা আনন্দ-বেদনায় মিশ্র বিজয় দিবস। বিজয়ের গৌরবের বাঁধভাঙা আনন্দের দিন। একই সাথে আজ লাখো স্বজন হারানোর শোকে ব্যথাতুর-বিহ্বল হওয়ারও দিন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী একাত্তর সালের এই দিনে ঢাকার ওই সময়ের রেসকোর্স ময়দানে (এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ করে।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর সকালে জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের কর্মকর্তা জন আর কেলি পৌঁছেন সেনানিবাসের কমান্ড বাঙ্কারে। সেখানে নিয়াজি নেই, ফরমান আলিকে পাওয়া গেল বিবর্ণ ও বিধ্বস্ত অবস্থায়। ফরমান আলি জানান, আত্মসমর্পণ-সংক্রান্ত মিত্রবাহিনীর প্রস্তাব তারা মেনে নিয়েছেন। তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সেই সংবাদ জানাতে পারছেন না। প্রস্তাব দেওয়া হলো জাতিসংঘের বেতার সংকেত ব্যবহারের। আত্মসমর্পণের জন্য বেঁধে দেওয়া সময় সকাল সাড়ে ৯টা থেকে আরও ছয় ঘণ্টা বাড়িয়ে আত্মসমর্পণের বার্তা পৌঁছানো হয় জাতিসংঘের বেতার সংকেত ব্যবহার করে। কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের (বর্তমান শেক্সপিয়র সরণি) একটি দোতলা বাড়িতে ছিল বাংলাদেশ সরকারের প্রথম সচিবালয় আর প্রধানমন্ত্রীর দফতর। ১৬ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরলেন তিনি। ফোন রেখেই তিনি জানালেন, সবাইকে জানিয়ে দিও আজ আমরা স্বাধীন। বিকেল ৪টায় আত্মসমর্পণ। ঢাকায়ও খবরটি পৌঁছে যায়। ঢাকাবাসী কী করবে আর কী করবে নাÑ বুঝে উঠতে পারছে না। এর আগে সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে মিত্রবাহিনী ঢাকায় প্রবেশ করে।

একাত্তর সালের পৌষের সেই পড়ন্ত বিকেলে রেসকোর্স ময়দান প্রস্তুত হয় ঐতিহাসিক বিজয়ের মুহূর্তের জন্য। বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক জোন ‘বি’ এবং ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির নেতৃত্বে আত্মসমর্পণ করেন ৯১ হাজার ৫৪৯ হানাদার সেনা। মেজর জেনারেল জ্যাকবের তৈরি করা আত্মসমর্পণের দলিলে বিকেলে সই করেন হানাদার বাহিনী লে. জেনারেল নিয়াজি এবং মিত্রবাহিনীর লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। মুজিবনগর সরকারের পক্ষে এ সময় উপস্থিত ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন একে খন্দকার। ৯ মাসের জঠর-যন্ত্রণা শেষে জš§ নিল একটি নতুন দেশ-বাংলাদেশ।

কৃতজ্ঞ জাতি আজ দিনভর বর্ণাঢ্য আয়োজনে সশ্রদ্ধ বেদনায় স্মরণ করবে দেশের পরাধীনতার গ্লানি মোচনে একাত্তর সালে প্রাণ উৎসর্গ করা বীর সন্তানদের। নতচিত্তে স্মরণ করবে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া শহীদদের। আজ ঢাকায় সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে সব স্তরের জনতার ঢল নামবে। শ্রদ্ধার সাথে তারা শহীদদের উদ্দেশে নিবেদন করবেন পুষ্পাঞ্জলি। বিজয় দিবস উপলক্ষে ভোর থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দেওয়াসহ ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। জাতীয় স্মৃতিসৌধসহ বিজয় দিবসের সব অনুষ্ঠান ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তাবলয়।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা দেশের জন্য আÍত্যাগকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তারা দেশবাসী, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, প্রবাসী বাংলাদেশিদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি বাণীতে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেছেন।

১৬ ডিসেম্বর সরকারি ছুটির দিন। সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি ভবনে উত্তোলন করা হবে জাতীয় পতাকা। দেশের বড় বড় শহরে প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ জাতীয় পতাকায় সাজানো হবে। গত রাতে গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হয়। সারাদেশে চলবে আজ বিজয়ের আনন্দ অনুষ্ঠান। ঢাকার বিভিন্ন বিদেশি দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কার্যালয়গুলোও আজ বিজয় দিবসে বন্ধ থাকবে। বিদেশেও বাংলাদেশি মিশনগুলোয় বিজয় দিবসের কর্মসূচি উদযাপিত হচ্ছে। দেশের সংবাদপত্রগুলো আজ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। বিটিভি, বেতারসহ বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করছে। হাসপাতাল, কারাগার ও এতিমখানাগুলোতে উন্নতমানের খাবার দেয়া হবে।

যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান বিজয় দিবস পালনের লক্ষ্যে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এ দিন ঢাকায় প্রত্যুষে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হবে। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে উপস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি কূটনীতিক, মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ভারতীয় সেনাবাহিনীর আমন্ত্রিত সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।

নিজস্ব প্রতিনিধি