শিশু ও নারী শ্রমিকদের প্রীতিকথা

শিশু ও নারী শ্রমিকদের প্রীতিকথা

মোমিন মেহেদীঃ
সারাদেশে আশংকাজনক হারে বাড়ছে শিশুশ্রম। শ্রম আইনে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও দারিদ্রতা ও প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার কারণেই শহর-গ্রাম সবখানেই বাড়ছে শিশুশ্রমিক। গৃহকর্মী থেকে শুরু করে নির্মাণকাজ, গাড়ির হেলপার, হোটেল- রেস্তোরাসহ ওয়ার্কশপে ওয়েল্ডিংয়ের মতো ঝঁকিপূর্ণ কাজে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করছে শিশুশ্রমিকরা। নামমাত্র শ্রম মজুরি নিয়ে দেশের রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় প্রায় ৫০ লাখ শিশু অপরিণত বয়সই শ্রম বিক্রির করছে। অনেক সময় অমানবিক ভাবে ১২ থেকে ১৮ ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করেও পায় না শ্রমের ন্যায্যমূল্য। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা পরিবারের অভাব মেটাতে শ্রম বিক্রিতে নেমেছে। বর্তমানে এর সংখ্যা দিন দিন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। মে দিবস কিংবা শ্রম অধিকার কি ওরা জানেনা। প্রতিনিয়ত বঞ্চনার শিকার হয় এরা।  দেশের শ্রমবাজারে শিশু শ্রমিকদের অবস্থা দিন দিন অবনতি ঘটছে। আর এই শিশুদের শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার না করতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিধিনিষেধ থাকলেও কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না শিশুশ্রম। গৃহকর্মী থেকে শুরু করে ভবন নির্মাণ কাজে, হোটেল-রেস্তোরা, ওয়ার্কশপ, ওয়েল্ডিংয় ও ইটভাটায় ইট পুড়ানোর মতো ঝঁকিপূর্ণ কাজে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করছে শিশু শ্রমিকরা। যাত্রীবাহী গাড়ি টেম্পু-জীপ-পীকআপ ও বাসের হেলপার হিসেবে বেশির ভাগই কাজ করছে শিশুরা। বয়স্কদের পাশাপাশি শিশুরাও সমভাবে শ্রম বিক্রি করছে। এতে শিশুশ্রমিকরা স্বাস্থ্য  সুরায় তিকর শ্রম বিক্রি করে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। অভাবের তাড়নায় এসব শিশুদের মা-বাবা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহনের জন্য বিদ্যালয়ে পাঠদানের জন্য না পাঠিয়ে নাম মাত্র মূল্যে গৃহস্থ কাজে কিংবা এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন। সারা দিন হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে, শিশুশ্রমিকরা মজুরি পায় ৩০ থেকে ১০০ টাকা। কমের্েত্র নিজেদের কোন স্বাধীনতা থাকেনা। কমের্েত্র সবচেয়ে বেশী বঞ্চিত হয় হোটেল-রেস্তোরার শিশুশ্রমিকরা। তারা ভোর ৬টা থেকে  রাত ১২ টা পর্যন্ত কাজ করেও ন্যায্য মজুরি পায় না। নেই চাকরির নিশ্চয়তা। যে কোনো সময় চলে যায় তাদের চাকরি। হয়ে পড়ে মুহুর্তেই বেকার। দেশের বিভিন্নস্থানে বৈধ অবৈধ উপায়ে প্রতিষ্ঠিত ইট ভাটায় কমপক্ষে ২ লক্ষ শিশু ইটভাটায় ইট পুড়াতে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে কেবলই মনে হচ্ছে “ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান/ আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন্ বলিদান/ আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ?”
একদিকে যেমন শিশুশ্রম বেড়ে যাচ্ছে; অন্যদিকে ঠিক তেমনি নারীশ্রম নিয়ে চলছে বৈষম্য। এই বৈষম্য দূর করার দায়িত্ব সরকারের। কেননা, একটি সরকার-ই পারে জনগনের পূর্ণ অধিকার ফিরিয়ে দিতে। তবে সরকারের সেই সদিচ্ছা থাকতে হয়। যা বর্তমান সরকারের আছে বলেতো মনে হয় না। যদি থাকতো, তাহলে একের পর অগ্নীকান্ডে, ভবনধসে শত শত নয়; হাজার হাজার শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্থ হতো না। আজ নারী শ্রমিকদের প্রতি বৈষম্যনারী শ্রমিকদের দুঃখ গাথার শেষ নেই। যে কোনো কাজেই তারা বৈষম্যের শিকার। যেহেতু শিক্ষার হার কম, সেহেতু পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় নারী শ্রমিকরাই প্রতিনিয়ত বঞ্চনা আর শোষণের শিকার। সমাজ কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনাচারণ, পারস্পরিক সম্পর্ক ও মূল্যবোধ। যদিও এই বর্তমানে সমাজ কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনাচারণ, পারস্পরিক সম্পর্ক ও মূল্যবোধ। সমাজ এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তিত হওয়ার মাধ্যমে প্রতিনিয়তই বদলে যাচ্ছে সামাজিক সম্পর্কের মাত্রা ও তার ব্যঞ্জনা। বাংলাদেশে বেশিরভাগ অঞ্চলে নারী শিক্ষার হার আনুপাতিক হারে কম হওয়ায় বিভিন্নভাবে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ অধিক মাত্রায় বিস্তৃত ও স্বীকৃত হয়েছে মূলত শ্রমিক হিসেবে। আর শ্রম দেয়ার ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে নির্মাণকাজেও নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। ভোর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত দরিদ্র পরিবারের গৃহবধূ থেকে শুরু করে ঘরের কিশোরী মেয়েরাও নারী শ্রমিক হিসেবে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ভবন নির্মাণ-বিনির্মাণের কাজে নিজেকে যুক্ত রাখছে। কাজের এই ক্ষেত্রগুলোতে দেখা যায়, নারীরা অধিকতর শ্রম দেয়ার পরও বৈষম্যের শিকার হয়ে পুরুষের তুলনায় কম মজুরি পাচ্ছে। উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করার সাহসও নেই। প্রতিবাদ করলে অনেক সময় প্রাপ্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করা হয়। এসব শ্রমজীবী নারীরা কিছু বলতে পারে না বলেই তাদের অন্যায়ভাবে শোষণ ও অত্যাচার করা হচ্ছে। অথচ তারাই সারাদিন খাটুনির পর বাসায় গিয়ে আবারো সাংসারিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। কিন্তু শ্রম হিসেবে নারীর শ্রমকে খাটো করে দেখার প্রবণতা আজো রয়ে গেছে। সর্বোপরি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর শ্রম বিশেষ অবদান রাখছে। অথচ কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিককে পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় কম পারিশ্রমিক দেয়া হয়। যদিও প্রায়ই নারী শ্রমিককে নির্ধারিত সময়ের বাইরে আরো অধিক সময় কাজ করতে হয়। কিন্তু কোনো অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দেয়া হয় না। শ্রম আইন এখানে অসহায়। স্বাধীনতার পর থেকে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা বাংলাদেশের পোশাকশিল্প টিকে আছে নারী শ্রমিকদের কারণে। নারী শ্রমিকদের কর্মদক্ষতা, সততা, আন্তরিকতা এবং নিষ্ঠার মাধ্যমে পোশাকশিল্প আজ বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। একজন নারী শ্রমিক যে পরিমাণ শ্রম দেয়, পাশাপাশি একজন পুরুষ শ্রমিক কিন্তু ততটা শ্রম দেয় না। নারী শ্রমিকরা ফাঁকি দেয় কম, কাজ করে বেশি। যখন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পোশাক সরবরাহ করতে হয়, তখন নারী শ্রমিকরা দিন-রাত পরিশ্রম করেন। নারীদের একদিকে থাকে সংসার, সন্তান, পারিবারিক কাজকর্ম, অপরদিকে থাকে অফিস। শত ঝড়-ঝঞ্ঝা মাথায় নিয়ে নির্বিকার চিত্তে কাজ করে নারী শ্রমিকরা। তারপরও তারা এত বেশি অবহেলিত কেন? কেউবা অল্প শিক্ষায় শিক্ষিত, কেউবা নিরক্ষর। কিন্তু শ্রম দেয়ার বেলায় শিক্ষিত শ্রমিকের চেয়ে কোনো অংশে কম শ্রম দিচ্ছে না। তাদের শ্রমকে পুঁজি করে মালিকরা হচ্ছে কোটিপতি।
এই কোটিপতিদের শৃঙ্খল ভেঙে নারীদের ন্যয্য অধিকার আদায়ের জন্য নিবেদিত হতে হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সচেতন প্রতিটি মানুষের। যাতে করে আগামী দিনগুলোতে একজন শ্রমিকও তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। সেই শ্রমিক শিশু, কিশোর, নারী যা-ই হোক। সেক্ষেত্রে শ্রমিক নেতৃবন্দকে হতে হবে আরো শ্রমিকবান্ধব।
আমরা দেখেছি যে, সাভার ট্রাজেডির মাধ্যমে শ্রমিকরা কতটা নিষ্পেষিত হয়েছে। সেই নিষ্পেষনরোধ করতে তৈরি হতে হবে প্রতিটি স্তরের মানুষকে। কেননা, এখন অধিকার আদায়ের জন্য সবচেয়ে যে বিষয়টি বেশি প্রয়োজন, সে বিষয়টি হলো-সাহস এবং সাহস। অতএব, সাহসের সাথে তৈরি হতে হবে বাংলাদেশের শ্রমিকদের জন্য। শ্রমিক যেহেতু অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। অতএব, শ্রমিকদের কথা আগে ভাবতে হবে সবার-ই। শুধু বছরে একবার মে দিবসে বড় বড় কথা বলা নয়; প্রকৃত অর্থে শ্রমিকদের কথা বলতে হবে প্রতিদিন-প্রতি মূহুর্তে…

লেখকঃ মোমিন মেহেদী, কলামিস্ট ও আহবায়ক, নতুনধারা বাংলাদেশ(এনডিবি)

Website: www.mominmahadi.com

অতিথি লেখক