মানিয়ে নেয়ার সংসার
জবরুল আলম সুমন: সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতের অমিল না থাকাটাই বরং অস্বাভাবিক। দুজন মানুষের পছন্দ, অভ্যাস, রাগ, অভিমান, চুপ করে থাকার পদ্ধতি পর্যন্ত যখন আলাদা, তখন মতের মিলটা কোথা থেকে আসবে সেটাই বরং রহস্য। তবুও বিয়ের পর আমরা সবাই একটা অসম্ভব কাজ করার চেষ্টা করি। সারাজীবন যে মানুষটাকে বোঝার চেষ্টা করবো, তার কাছ থেকেই আশা করি সেও আমাকে একটু বুঝবে।
…
সমস্যাটা শুরু হয় তখন, যখন মনে হয় আমি যা বলতে চাই, সেটা স্ত্রী শুনছেন ঠিকই, কিন্তু বুঝছেন তাঁর নিজের সুবিধামতো। আর আমি কী চাই, সেটা তিনি বেশ ভালোই বোঝেন, শুধু সেটা আমি কেন চাই, সেই অংশটুকু বোঝার কোনো প্রয়োজন তিনি অনুভব করেন না। সংসারে এর চেয়ে সূক্ষ্ম মানসিক নির্যাতন আর কী হতে পারে!
…
তবে স্ত্রীর একটা অসাধারণ ক্ষমতা আছে। স্বামী কখন মন খারাপ করে আছে, সেটা তিনি খুব সহজেই বুঝতে পারেন। কেন মন খারাপ, সেটা না বুঝলেও মন খারাপ যে হয়েছে, সেটা তাঁর চোখ এড়ায় না। তারপর এমন স্বাভাবিকভাবে সংসারের কাজকর্ম চলতে থাকে, যেন আমার মন খারাপটা রাষ্ট্রীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, যার জন্য সংসারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে।
…
এমন অবস্থায় বাঙালি পুরুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো নিজের আত্মীয়স্বজনের কাছে একটু বিচার চাওয়া। অবশ্য এটাকে বিচার বলা ঠিক হবে না। সেখানে বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। বরং নিজের বিপদটা একটু সুন্দর করে বর্ণনা করে এমন কিছু বিনামূল্যের উপদেশ পাওয়া, যার প্রয়োগ করলে বিপদ আরও বাড়তে পারার সমূহ আশংকা থাকে।
…
বাবার কাছে গিয়ে নিজের কষ্টের কথা বললে তিনি খুব মন দিয়ে শোনেন। মাঝখানে কোনো মন্তব্য করেন না। সব শুনে এমন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, যেন তাঁর যৌবনেও একই সমস্যার কারণে তিনিও বহুবার জাতিসংঘে অভিযোগ করার কথা ভেবেছিলেন। তারপর সেই ঐতিহাসিক পরামর্শ আসে, আরও একটু মানিয়ে নাও। বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ আছে।
…
বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ কথাটা বাবা এমনভাবে বলেন, যেন আমার বউয়ের সঙ্গে আমার ঝামেলা নয়, জাতিসংঘে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
…
মায়ের কাছে গেলে পরামর্শটা একটু অন্য রকম হয়, কিন্তু ফল একই। সংসার করতে গেলে অনেক কিছু মানতে হয়। মেয়েদের একটু বুঝতে হয়। নিজের কথাটা একটু কম বলতে হয়। অর্থাৎ সংসারের শান্তির জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ সমাধান হলো, যে মানুষটি সমস্যায় আছে তাকেই আরও কিছু দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া।
…
একদিন এক আত্মীয়ের কাছেও নিজের সমস্যার কথা বলেছিলাম। মূল সমস্যাটা ছিল, স্ত্রী আমি কী চাই সেটা বুঝতে চায় না। আত্মীয় খুব বিজ্ঞ মুখ করে জানালেন, আমাকেও তো স্ত্রী কী চান সেটাও বুঝার চেষ্টা করতে হবে। আমি অব্যহতভাবে যে চেষ্টা করে যাচ্ছি, সেটাও জানালাম। তখন পরামর্শ এলো, তাহলে আরও চেষ্টা করতে হবে।
…
বাঙালি আত্মীয়দের কাছে সংসার সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো আরও একটু ধৈর্য ধরা, আরও একটু সহ্য করা এবং অবশ্যই বাচ্চাদের ভবিষ্যতের কথা ভাবা। কখনো কখনো মনে হয়, বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ না থাকলে আমাদের সংসারও বোধহয় এতদিনে ভবিষ্যৎ হারিয়ে ফেলতো।
…
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে না, আমি কেমন আছি। সবাই জানতে চায়, বাচ্চারা কেমন আছে। অর্থাৎ সংসারে বাবা-মায়ের মানসিক শান্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তারা ভালো থাকুক বা না থাকুক, বাচ্চারা যেন ভালো থাকে। এই তত্ত্বের শেষ ফল কী, সেটা অবশ্য কেউ বলে না।
…
সমস্যা হলো, সবকিছু চাইলেই মানা যায় না। একটা কথা ছেড়ে দেওয়া যায়, দুটো অভিমান গিলে ফেলা যায়, নিজের কোনো পছন্দকে একটু পেছনে সরিয়ে রাখা যায়। কিন্তু প্রতিদিন যদি মনে হয়, নিজের কথাটা কেউ বুঝতে চাইছে না, নিজের প্রয়োজনটা কারও কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়, তখন ব্যাপারটা আর একটা নির্দিষ্ট ঝগড়ার মধ্যে থাকে না। মানুষ তখন একই ঘরে থেকেও ধীরে ধীরে একা হয়ে যায়।
…
আবার ছেড়ে দেওয়াও যায় না। কারণ সংসার শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নয়। সেখানে সন্তান আছে, পরিবার আছে, মায়া আছে, বছরের পর বছর জমে থাকা স্মৃতি আছে। আছে এমন অনেক সকাল, যেগুলো একসঙ্গে শুরু হয়েছে, এমন অনেক রাত, যেগুলো একসঙ্গে শেষ হয়েছে। আছে অসংখ্য ছোটখাটো সুখ, যেগুলোর কোনো হিসাব রাখা হয়নি। তাই না পারা যায় মানতে, না পারা যায় ধরে রাখতে।
…
সংসার তখন অনেকটা পুরোনো একটা জামার মতো হয়ে যায়। শরীরে আর আগের মতো ঠিক লাগে না, কোথাও টানে, কোথাও ঢিলে, তবু ফেলে দিতে মায়া হয়। কারণ জামাটার সঙ্গে শুধু কাপড় নয়, অনেক দিনের গন্ধও লেগে থাকে।
…
তারপরও জীবন চলে। সকালে বাচ্চাদের স্কুল, বাজার, রান্না, কাজকর্ম, হিসাবনিকাশ। দিনের মধ্যে কোথাও একটু হাসি, কোথাও বিরক্তি, কোথাও অভিমান। রাত হলে আবার মনে হয়, কাল থেকে সব ঠিক করে ফেলবো। আর কোনো কথা বাড়াবো না। একটু বেশি বুঝবো, একটু কম বলবো, একটু বেশিই মানিয়ে নেব।
…
এইভাবে একেকটা কাল উড়ে এসে একেকটা আজকে খেয়ে ফেলে। আর আমরা ভাবতে থাকি, বাচ্চাদের ভবিষ্যতের জন্যই তো সব করছি। কখনো কখনো খুব জানতে ইচ্ছে করে, বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে গিয়ে আমরা কি নিজেদের বর্তমানটাকেই একটু বেশি পুরোনো করে ফেলছি? প্রশ্নটা কাউকে করা হয় না, কারণ উত্তরটা আমরা মোটামুটি জানিই। বাঙালি সংসারে সব প্রশ্নের শেষ উত্তর একটাই, আরও একটু মানিয়ে নাও। মানিয়ে নেয়ার নামই সংসার কিংবা মানিয়ে নেয়াই জীবন।।
…
লেখক: জবরুল আলম সুমন: প্রাবন্ধিক।।
